বৈশ্বিক সংকটের মুখে জাতিসংঘের দিকনির্দেশনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব যখন যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর করণীয় তুলে ধরলেন। তাঁর এই ভাষণ শুধু একটি কর্মসূচি নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি এক গভীর সতর্কবার্তা ও নৈতিক আহ্বান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এই ভাষণটি ছিল তাঁর শেষ বার্ষিক অগ্রাধিকার ভাষণ, যা ভবিষ্যৎ বিশ্বের জন্য এক ধরনের বিদায়ী দিকনির্দেশনাও বটে।
গুতেরেস তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব আজ এমন এক সংকটকাল অতিক্রম করছে যেখানে সংঘাত, দায়মুক্তি, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই স্বাভাবিক রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই তা ভেঙে পড়ছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অবক্ষয়—এই সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০২৬ সালের জন্য নিজের অগ্রাধিকার তুলে ধরে গুতেরেস ভবিষ্যতের পথনির্দেশনায় তিনটি মৌলিক নীতির কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই জাতিসংঘ সনদের মর্যাদা রক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে বিশ্বশান্তি কেবল একটি শব্দে পরিণত হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
শান্তি প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, শান্তি মানেই শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়। গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও ইয়েমেনের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কেবল অস্ত্র নীরব করলেই শান্তি আসে না। দারিদ্র্য, বৈষম্য, উন্নয়নের ঘাটতি ও জলবায়ু সংকটের মতো সংঘাতের মূল কারণগুলো মোকাবিলা না করলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে শান্তির পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠাও এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বিভাজন নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন গুতেরেস। বৈষম্য, বঞ্চনা, বর্ণবাদ ও ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, ভাঙনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে কোনো বৈশ্বিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক আইনের অবক্ষয় নিয়ে গুতেরেস বলেন, এটি কোনো গোপন প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি আমাদের চোখের সামনে, স্ক্রিনে, সরাসরি ঘটছে। বেসামরিক নাগরিক ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর হামলা, অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল, ভিন্নমত দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। এসব ঘটনা গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মহাসচিব।
বিশ্বে সম্পদের ভয়াবহ বৈষম্য নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের হাতে বর্তমানে প্রায় অর্ধেক বৈশ্বিক সম্পদ কেন্দ্রীভূত থাকার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদীয়মান প্রযুক্তি প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেন, মানবজীবন প্রভাবিত করা অ্যালগরিদম যেন কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে নিয়ন্ত্রিত না হয়। প্রযুক্তিকে মানবতার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, মানবতাকে প্রযুক্তির অধীনে নয়—এই বার্তাই তিনি স্পষ্ট করে দেন।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, জলবায়ু বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত বিশ্ব কখনো শান্ত হতে পারে না। সাময়িকভাবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সীমা অতিক্রম অনিবার্য হলেও এটি স্থায়ী হবে না বলেই তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দ্রুত নির্গমন হ্রাস, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায্য রূপান্তর এবং জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, ১৯৪৫ সালের কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
ভাষণের শেষভাগে আবেগঘন কণ্ঠে গুতেরেস স্মরণ করিয়ে দেন, এটি তাঁর শেষ বার্ষিক অগ্রাধিকার ভাষণ। তবে এটিকে বিদায় নয়, বরং নতুন লড়াইয়ের অঙ্গীকার হিসেবেই তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের প্রতিটি দিন তিনি কাজে লাগাতে চান সেই ভালো বিশ্বের জন্য, যা মানবজাতি সম্ভব বলে জানে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা গুতেরেসের মেয়াদকাল শুরু হয়েছিল প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণের আশাবাদী সময় থেকে। আর তাঁর শেষ ভাষণে এসে তিনি যেন বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিলেন—এই আশাবাদ রক্ষা করতে হলে এখনই বৈশ্বিক নৈতিক সাহস ও ঐক্য প্রয়োজন।











