ব্রিটিশ রাজপরিবারে প্রথম নারী জ্যোতির্বিদ মিশেল ডাউহার্টি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ব্রিটিশ রাজপরিবারের ৩৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘অ্যাস্ট্রোনোমার রয়্যাল’ পদে একজন নারী প্রফেসর মিশেল ডাউহার্টি নিয়োগ পেলেন। যা বিজ্ঞান ও নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
নারী নেতৃত্ব এখন আর শুধু রাজনীতি বা সমাজকেন্দ্রিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণার মতো জটিল ক্ষেত্রেও নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় ইতিহাস সৃষ্টি করছেন। এমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ৩৫০ বছরের পুরোনো প্রথা ভেঙে প্রথম নারী জ্যোতির্বিদ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন প্রফেসর মিশেল ডাউহার্টি।
ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত এই পদটি রাজপরিবারের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা পদ হিসেবে বিবেচিত। এই অনন্য অর্জন কেবল ডাউহার্টির ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং এটি নারীর ক্ষমতায়নের পথে এক সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
১৬৭৫ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের আদেশে ‘অ্যাস্ট্রোনোমার রয়্যাল’ খেতাবটি প্রথম চালু হয়। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন ফ্ল্যামস্টিড এ পদটির প্রথম অধিকারী ছিলেন। সে সময়ে এ পদটির মূল দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে মহাকাশ ও সময় নির্ণয়ের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়া।
কালের পরিক্রমায় এ পদটি একটি প্রতীকী ও পরামর্শদায়ী ভূমিকায় রূপ নেয়। যেখানে রাজপরিবার ও দেশের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন পদাধিকারী ব্যক্তি।
তবে ৩৫০ বছর ধরে এ পদে কেবল পুরুষরা ছিলেন। কিন্তু সেই ইতিহাসে এবার নতুন সংযোজন এল। ব্রিটিশ রাজপরিবারের রাজা ঘোষণা দেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী প্রফেসর মিশেল ডাউহার্টি এ পদে মনোনীত হচ্ছেন।
‘অ্যাস্ট্রোনোমার রয়্যাল’ হিসেবে ডাউহার্টির মূল দায়িত্ব হলো রাজপরিবার এবং প্রয়োজনে সরকারের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা। যদিও আধুনিক যুগে রাজা বা রানি বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তে সরাসরি জড়িত নন। তবে এ পদটি প্রতীকীভাবে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানচর্চায় রাজকীয় সমর্থনের পরিচায়ক। এ সম্মানজনক দায়িত্বের মাধ্যমে ডাউহার্টি সরকারি বিজ্ঞান নীতিমালার আলোচনায় মতামত দিতে পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তার অবদান রাখতে পারেন।
এ ছাড়া তার আরেকটি বড় ভূমিকা হবে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা। প্রফেসর ডাউহার্টি বরাবরই বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে সক্রিয়। বিশেষ করে তরুণদের এবং নারীদের বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় আগ্রহী করে তুলতে তার উদ্যোগ প্রশংসিত।
এ পদে থেকে তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা, মিডিয়ায় উপস্থিতি এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রাণবন্ত করে তুলবেন।
ডাউহার্টির নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই একদিকে আনন্দের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে ছিল সাধারণ প্রশ্ন— ‘এ পদে তিনি কি নারী বলেই মনোনীত?’ এর জবাবে মিশেল অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলেন, ‘আমি চাই না কেউ ভাবুক, আমি নারী বলে এই পদে এসেছি। আমি চাই মানুষ জানুক, আমি এসেছি আমার কাজ, গবেষণা এবং যোগ্যতার মাধ্যমে।’ তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, একজন নারী হিসেবে তার এই ভূমিকাটি অন্য নারীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যখন একজন নারী আমার মতো কাউকে এই পদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে, তখন হয়তো তার মনে প্রশ্ন জাগবে, আমি কেন নয়?’
বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি চাই মানুষ মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের রোমাঞ্চ অনুধাবন করুক। আমরা যখন রাতের আকাশ দেখি বা দূরবীন দিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে তাকাই, তখন আমরা উপলব্ধি করি, আমরা কতটা ক্ষুদ্র। এ ধারণা আমাদের জীবনে বিনয় আনতে পারে। আমাদের আচরণে সহানুভূতি বাড়াতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, মহাকাশ গবেষণার প্রযুক্তি যেমন উদ্ভাবনী, তা আবার শিল্প ও অর্থনীতিতে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ পদে একজন নারী হিসেবে মিশেল ডাউহার্টির উপস্থিতি নিজেই একটি অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বিজ্ঞান ও গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো সীমারেখা নেই। STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তার অবস্থান একটি রোল মডেলের মতো কাজ করবে। তরুণী শিক্ষার্থীদের জন্য তার এ নিযুক্তি একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে যে, ‘তুমিও পারো।’
প্রফেসর মিশেল ডাউহার্টির নিয়োগ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। যা শুধু বিজ্ঞান বা ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে নয়, বরং নারীর সক্ষমতা ও সম্ভাবনার ইতিহাসেও একটি নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। একদিকে তিনি বিজ্ঞানকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়, অন্যদিকে দেখিয়ে দিয়েছেন নারী মানেই সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এক নতুন সম্ভাবনার নাম।
আজকের নারীরা শুধু গৃহকোণে সীমাবদ্ধ নন। তারা মহাকাশেও নিজেদের ছাপ ফেলছেন। আর মিশেল ডাউহার্টি সেই সাহসিকতার প্রতীক। যিনি ৩৫০ বছরের পুরোনো গণ্ডিকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেছেন; আলো ছড়াচ্ছেন, পথ দেখাচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, গভ.ইউকে; অফিসিয়াল প্রেস রিলিজ










