59822

কাজী জাফর আহমদের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিউজ ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মরহুম কাজী জাফর আহমদের ১০ম মৃতুবার্ষিকী আজ। ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট মারা যান তিনি। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের উদ্যোগে আজ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া কাজীবাড়ীতে দিনব্যাপী কোরআন তেলাওয়াত, মরহুমের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।

কাজী জাফর আহমদ ৬৪ বছরের এক বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে তিনি রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন। রাজশাহী জেলা ছাত্র ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক এবং রাজশাহী কলেজ সাহিত্য মজলিশের মুখপত্র, সাহিত্যিকীর সম্পাদক হিসেবে তার কর্মময় রাজনীতিতে পদচারণা শুরু।

ads

১৯৩৯ সালের ১ জুলাই কুমিল্লার চিওড়া কাজী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এমএ (ইতিহাস) পাস করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ এবং এলএলবি কোর্স সম্পন্ন করা সত্ত্বেও কারাগারে চলে যাওয়ায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারেননি।

কাজী জাফর ১৯৫৯-১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৬২-১৯৬৩ সালে অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (এপসু) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

ads

১৯৬২ সালে সামরিক শাসন ও ঐতিহাসিক শরীফ শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে কাজী জাফর আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র জীবন শেষে তিনি শ্রমিক রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

কাজী জাফর ১৯৮৪ সালে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (এসকফ) আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় ও সরকারের সঙ্গে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের মূল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কাজী জাফর আহমদ ১৯৭০ সাল থেকেই প্রচেষ্টা শুরু করেন। ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে ঢাকার পল্টন ময়দানে আয়োজিত জনসভা থেকে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশ কায়েমের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এ জনসভার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন কাজী জাফর আহমদ। এ জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের তিনি অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তার সুদক্ষ নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার পতাকা উড্ডয়ন করেন।

১৯৭২-১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন ছিলেন ন্যাপের সভাপতি। এরপর ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টির (ইউপিপি) প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরে চেয়ারম্যান হিসেবে সক্রিয়ভাবে পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব ও জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন।

তিনি ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীপরিষদের শিক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬-১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পার্টির সরকারে পর্যায়ক্রমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বন্দর-জাহাজ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশ সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ১৯৮৯-১৯৯০ সালে দেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৬-১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের উপনেতা এবং ১৯৮৯-১৯৯০ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। ১৯৮৬-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কাজী জাফর।

তিনি ১৯৯৯-২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনি’ এর ‘ভিজিটিং ডিস্টিঙ্গুইসড প্রফেসর’ হিসেবে দক্ষিণ এশীয় ভূ-মন্ডলীয় রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগে কাজী জাফর আহমদ তৎকালীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা হিসেবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও কাজী জাফর আহমদের রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। ১৯৭৮ সালে তিনি এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শিক্ষামন্ত্রী সম্মেলনে সহ-সভাপতি, ১৯৭৭-১৯৮৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল জুচে (স্বনির্ভর) ইনস্টিটিউটের পরিচালক, ১৯৮৬ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এসকাপ ট্রেড মিনিস্টারস্ সম্মেলনের চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৭-১৯৮৮ সালে এশীয়-৭৭ জাতি মন্ত্রিপরিষদের চেয়ারম্যান, ১৯৮৭ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৭ম আন্কটাড্ সমাপ্তি অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে ছিল তার পরিচিতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক।

ad

পাঠকের মতামত