ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বর হামলা নিন্দনীয়
নিউজ ডেস্ক: গত শনিবার (১১ নভেম্বর) রিয়াদে অনুষ্ঠিত আরব ইসলামিক সামিটে ফিলিস্তিনের বিষয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। উক্ত সামিটের রেজুলেশন তথা গৃহীত সিদ্ধান্তের চুম্বক অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো—
আমরা, অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এবং আরব স্টেট লিগের রাষ্ট্র ও সরকারের নেতৃবৃন্দ ওআইসি এবং আরব লিগ যে দুটি শীর্ষ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা একসঙ্গে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমরা আল-কুদস এবং আল-শরিফসহ গাজা উপত্যকায় এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের বর্বর আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে আমাদের যৌথ অবস্থান ব্যক্ত করছি। এই আগ্রাসন তো বটেই, এর কারণে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটছে, তা মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করার নিশ্চয়তা প্রদান করছি। আমরা ইসরাইলের সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ চাই, যা দখলদারিত্বের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, বিশেষ করে তাদের স্বাধীনতার অধিকার এবং তাদের জাতীয় ভূখণ্ডে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকার থেকে।
আমরা ইসরাইলের দ্বারা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল এবং ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার অধিকারসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টাকেও সাধুবাদ জানাই।

আমরা ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকৃত অঞ্চলকে মুক্ত করার এবং তাদের সব অবিচ্ছেদ্য অধিকার পূরণের জন্য তাদের বৈধ সংগ্রামে আমাদের পূর্ণ শক্তি ও সামর্থ্যের সঙ্গে আমাদের অবস্থান নিশ্চিত করছি। আমরা ইসরাইলের সহিংসতা ও যুদ্ধের চক্র থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের রক্ষা করার উপায় হিসেবে কৌশলগত বিকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সব মানুষের জন্য নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা মনে করি, ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান না ঘটিয়ে এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন না করা পর্যন্ত এটা অর্জন করা সম্ভব নয়। ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার উপেক্ষা করে আঞ্চলিক শান্তি অর্জন করাটাও অসম্ভব। ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের পূর্ণ সমর্থন পাবে।
ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার খর্ব, ধর্মীয় পবিত্রতা লঙ্ঘন, সহিংসতা এবং সংঘাতের ধারাবাহিকতা বৃদ্ধির জন্য আমরা দখলদার শক্তি ইসরাইলকেই দায়ী করি। ইসরাইল তার পদ্ধতিগত আক্রমণাত্মক নীতি ও অবৈধ দখলদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ইসরাইল ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনিরা তাদের হারানো অধিকার ফিরে না পায়। ইসরাইলি দখলদারিত্ব এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা ইসরাইলের সব বৈষম্যমূলক ও ঘৃণ্য কাজকে নিন্দা জানাই।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি হামলা ও গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের প্রতিশোধমূলক আগ্রাসন নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধের অসম্মতি এবং এই আগ্রাসন বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে নিরাপত্তা পরিষদের অক্ষমতার ফলে এই সংঘাত সম্প্রসারণের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাই আমরা। একই সঙ্গে পূর্ব আল-কুদসসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর বর্বর, অমানবিক ও নৃশংস হামলা, গণহত্যার নিন্দা জানাই। অবিলম্বে এই আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য—এই প্রতিশোধমূলক যুদ্ধকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা কিংবা যে কোনো অজুহাতে একে সমর্থন করা প্রত্যাখ্যান করুন। অবরোধ ভেঙে গাজা উপত্যকায় খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানিসহ সব ধরনের মানবিক সাহায্য কনভয়গুলোকে অবিলম্বে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হোক। আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ কাজে অংশগ্রহণের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাই।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস ফর প্যালেস্টাইন রিফিউজি এজেন্সিকে (ইউএনআরডব্লিউএ) কাজ করার সুযোগ করে দিতে জোর দাবি জানাচ্ছি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে এক্ষেত্রে নিষ্পত্তিমূলক ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ কাজে সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আন্তর্জাতিক বৈধতা রেজুলেশন লঙ্ঘন করে—এমন কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নিরপরাধ মানুষ, শিশু, বয়স্ক ও মহিলাদের হত্যা করে গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার রাস্তা পরিহার করতে হবে। ফিলিস্তিনি জনগণকে নির্বিচারে হত্যা এবং তাদের বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল, মসজিদ, গির্জা ধ্বংসের কাজে ব্যবহূত অস্ত্র ও গোলাবারুদ রপ্তানি বন্ধ করার জন্য দেশগুলোকে আহ্বান জানাই আমরা।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে অবিলম্বে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বন্ধ করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ তো করতেই হবে, সেই সঙ্গে ওষুধ, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহসহ যোগাযোগ ও ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা সচল করার কাজে হাত দিতে হবে। এই কাজগুলো নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধের সমান। বছরের পর বছর গাজা উপত্যকায় ইসরাইল যে অবরোধ আরোপ করে আসছে, তা তুলে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছি আমরা।
কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি চাপ প্র্রয়োগ এবং মানবতার বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব ও অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওআইসি ও আরব লিগের সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই আমরা। আমরা জোর দিয়ে বলছি, আরব ও ইসলামিক দেশগুলো কোনো ধরনের দ্বিমুখী আচরণ কিংবা নীতি মেনে নেবে না। সত্যিকার অর্থেই, এমন কোনো নিয়মনীতি আমাদের প্রভাবিত করতে পারবে না, যা সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে।
গাজা উপত্যকার উত্তর থেকে দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ১৫ লাখ ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুতের ঘটনা ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন এবং এর ১৯৭৭ প্রোটোকল অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের শামিল। এর তীব্র নিন্দা জানাই আমরা। এই করুণ অমানবিক বাস্তবতাকে চিরস্থায়ী করার চিন্তাকে নস্যাত্ করার জন্য ঔপনিবেশিক দখলদার কর্তৃপক্ষের সব ধরনের প্রচেষ্টা মোকাবিলা করতে জাতিসংঘের সব সংস্থার প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।
আমরা জেরুজালেমের ইসলামিক ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরাইলি হামলার তথা, অবৈধ পদক্ষেপের নিন্দা জানাই। পবিত্র স্থানগুলোতে বিদ্যমান আইনি ও ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থাকে সম্মান করার গুরুত্বের ওপরও জোর দিচ্ছি আমরা।
ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি ও স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো ফিলিস্তিনি ও আরব ভূখণ্ডে তাদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো। ফিলিস্তিনি জনগণের যাবতীয় বৈধ অধিকার, বিশেষ করে একটি ‘দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান’ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেক কিছু করার আছে। আন্তর্জাতিক বৈধতা ও আরব শান্তি উদ্যোগের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই কাজ করতে হবে।
মোটকথা, পূর্ব জেরুজালেমে রাজধানী প্রতিষ্ঠাসহ একটি মুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম সত্তা হিসেবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। এই লক্ষ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন আহ্বান করার দাবি জানাই আমরা। আরব লিগ এবং ওআইসি উভয়ের মহাসচিবকে রেজুলেশনের বাস্তবায়ন ঘনিষ্ঠভাবে তদারকি করতে এবং নিজ নিজ কাউন্সিলের আসন্ন অধিবেশনে উপর্যুক্ত বিষয়ের ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করার জন্য অনুরোধ জানাই আমরা।
আরব নিউজ থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ










