65464

ফ্রান্সের জাতীয় দিবসে ফরাসি বিপ্লবের স্মরণ, ইউরোপীয় সংহতির বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় দিবস ‘ফেত নাসিওনাল’ উদযাপন করেছে ফ্রান্স। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে সূচিত ফরাসি বিপ্লবের ২৩৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানী প্যারিসসহ দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় সামরিক কুচকাওয়াজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, নাগরিক সমাবেশ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি।

এবারের জাতীয় দিবস উদযাপনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ইউক্রেনের প্রতি সংহতি এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার বার্তা। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর আমন্ত্রণে ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর অংশ হিসেবে ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা, পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০০ সেনাসদস্য প্যারিসের কুচকাওয়াজে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও উপস্থিত ছিলেন। ফরাসি সরকার এই অংশগ্রহণকে ইউরোপীয় নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।

ads

জাতীয় দিবসের প্রধান আকর্ষণ ছিল প্যারিসের ঐতিহাসিক শঁজেলিজে অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত সামরিক কুচকাওয়াজ। এতে প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাড়ে সাত হাজার সেনাসদস্য, শতাধিক সামরিক যান, ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অংশ নেয়। ফরাসি বিমানবাহিনীর অ্যারোবেটিক দল ‘পাত্রুই দ্য ফ্রঁস’ আকাশে নীল, সাদা ও লাল ধোঁয়ার রেখায় জাতীয় পতাকার প্রতীক ফুটিয়ে তোলে।

প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে দেওয়া ভাষণে ইউরোপের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যৌথ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ads

জাতীয় দিবস এবং একই দিনে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, রেলস্টেশন, পর্যটন এলাকা ও অনুষ্ঠানস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ, জঁদারমেরি ও সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেন।

এ বছর জাতীয় দিবসের আরেকটি ব্যতিক্রম ছিল প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের ঐতিহ্যবাহী আতশবাজির আয়োজন। ১৪ জুলাইয়ের পরিবর্তে এটি ১৩ জুলাই রাতে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রায় ১,৬০০ ড্রোনের আলোক প্রদর্শনী, সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং বর্ণিল আতশবাজি দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়।

জাতীয় দিবসের আগের রাতগুলোতে প্যারিসের বিভিন্ন অগ্নিনির্বাপক স্টেশনে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী “বাল দে পম্পিয়ে”-তে হাজারো মানুষ অংশ নেন। সঙ্গীত, নৃত্য ও সামাজিক মিলনমেলার এই আয়োজন ফরাসি সংস্কৃতির অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত।

প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিঁও, বোর্দো, তুলুজ, লিল, নিস ও স্ট্রসবুর্গসহ দেশের বিভিন্ন শহরে কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্থানীয় উৎসব ও নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে সামন্তব্যবস্থার অবসান, মানব ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণা এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব বা “লিবের্তে, এগালিতে, ফ্রাতেরনিতে” আজও ফরাসি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় মূলমন্ত্র।

১৮৮০ সালে ১৪ জুলাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বাস্তিল দুর্গ দখলের ২৩৭ বছর পরও দিনটি ফরাসিদের কাছে কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিবস নয়; বরং গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।History

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ফেত নাসিওনাল ছিল শুধু একটি জাতীয় উৎসব নয়; ইউক্রেনকে সমর্থন, যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইউরোপীয় সংহতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফ্রান্সের কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

ad

পাঠকের মতামত