17725

খাল ও লেকে পয়োঃবর্জ্য ফেলা বন্ধ করুন : এলজিআরডি মন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা শহরের পয়োঃবর্জ্য খাল ও লেকে ফেলা বন্ধ করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম। একই সাথে শুধু মানুষের প্রতি ভালবাসা নয়, নিজের শহরকে ভালোবাসারও আহবান জানান তিনি। অপরদিকে পয়ো:ব্যবস্থাপনা নিয়ে নগরবাসীকে ভাবার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ভালবাসা দিবস একদিন, শহরকে ভালবাসি প্রতিদিন’ প্রতিপাদ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কর্মশালায় তারা এ আহবান জানান।

ads

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোঃ আতিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। এছাড়াও কর্মশালায় রাজউক,ঢাকা ওয়াসা, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি এবং এনজিও প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।

ads

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, রাজধানীর অধিকাংশ পয়োঃবর্জ্য খালে ও লেকে ফেলা হয়। এটি দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এই পয়োঃবর্জ্যের লাইন কিভাবে বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা করার পাশাপাশি একটা টাইমলাইন নির্ধারণ এবং গুরুত্ব দিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘শুধু মানুষকে ভালবাসলে হবে না, আমরা যে শহরে বসবাস করি সে শহরকে ভালবাসার পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশকে ভালবাসতে হবে। নিজের আবাসস্থল, চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলে শহরের প্রতি ভালোবাসার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

তাজুল ইসলাম বলেন,আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরতে গিয়ে অনেক সুন্দর নগরী দেখি তখন স্বাভাবিকভাবে মনে হয় যদি আমাদের শহরটিও এমন হতো। মন্ত্রী বলেন, তাদের শহর সুন্দর শুধু সরকার বা সিটি কর্পোরেশন করেনি। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো বলেই সম্ভব হয়েছে। সবার স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলেই কেবল ঢাকা নগরীকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন,ঢাকা শহরকে স্যুয়ারেজের আওতায় নিয়ে আসতে ৫টি পয়োঃশোধনাগার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দাশেরকান্দি প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে পুরো ঢাকা শহরের পয়োঃশোধনাগার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এলজিআরডি মন্ত্রী বলেন, হাতিরঝিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ড্রিম প্রজেক্ট ছিল। সেখানে স্টেডিয়াম করার প্রস্তাব থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী মানুষের জন্য হাতিরঝিল নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন রাজধানীতে এরকম আরো অনেক হাতিরঝিল করা সম্ভব। তিনি বলেন, ঢাকা ওয়াসার নিকট থেকে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ও খালের দায়িত্ব দুই সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন রাজধানীতে যেসকল লেক আছে সেগুলো সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তরের দাবি আসছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানান মন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, রাজধানীর উচ্চবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের এলাকায় পানি, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য ইউটিলিটির মূল্য সমান হতে পারে না। ঢাকা নগরীতে কোথায় হাই রাইজ বা লো রাইজ বিল্ডিং হবে, কোথায় আবাসিক বা কমার্সিয়াল জোন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।

মানুষের জন্য সড়ক, খেলার মাঠ, ট্রাপিক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদনের স্থানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার। শুধু উচু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না, সামগ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু শহর নয় সারাদেশের মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ সমন্বিত ভাবে কাজ করলে পরিবর্তন অবধারিত।

অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি মেয়র মোঃ আতিকুল ইসলাম সুষ্ঠু পয়োনিস্কাশন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নগরবাসীকেও ভাবার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভবন ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকরী সেপটিক ট্যাংক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এটি সবাইকে করতে হবে। বাসা-বাড়ির পানি কোথায় যাবে, কিভাবে আধুনিক উপায়ে নিষ্কাশন হবে, সে বিষয়ে প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে তিনি জনগণকে নকশা তৈরি করার আনুরোধ জানান। মেয়র বলেন, এই শহরকে এভাবে রাখা যাবে না। একটি সুন্দর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পয়োনিষ্কাশন উৎস থেকে ব্যবস্থাপনা করা হলে সবচেয়ে ভালো হয়।

ভালবাসা একদিন, শহরকে ভালবাসুন প্রতিদিন’ প্রতিপাদ্যে পয়োনিষ্কাশন কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে মেয়র আতিক বলেন, এই যে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছে, এর ফলে আমাদের অনেক জ্ঞান-অভিজ্ঞতা বিনিময় হলো। তিনি আরো বলেন, সিটি মেয়র হিসেবে আমি চাই নগরবাসীর জন্য, সুন্দর নগরীর জন্য, খালে স্বচ্ছ প্রবাহমান পানি থাকুক। সেখানে মাছের চাষ দেখতে চাই। ময়লা-আবর্জনামুক্ত খাল দেখতে চাই। খাল দিয়ে নদীর সাথে নৌকা চলাচলের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করতে চাই।

ডিএনসিসি মেয়র বলেন, এগুলো আগে সম্ভব ছিল। কিন্তু আমরা এই সম্ভবগুলোকে অসম্ভব করে তুলেছি। বিভিন্ন জায়গায় অনেকে পাইপ দিয়ে রাস্তা তৈরি করেছে। সেগুলো তুলে নিয়ে সেখানে দৃষ্টিনন্দন বেইলি ব্রিজ তৈরি করার আহবান জানান মেয়র, যাতে ব্রিজের নিচ দিয়ে যাতে নৌকা চলতে পারে। মেয়র বলেন, চারটি নদীর সাথে আমরা সংযোগ স্থাপন করতে চাই। এই হচ্ছে আমাদের স্বপ্ন। হাতিরঝিল থেকে কালাচাঁদপুর, বনানী কবরস্থান, কড়াইল বস্তি যাওয়া যাবে। এজন্য কয়েকটি ব্রিজ উঁচু করতে হবে। এজন্য আমরা একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছি, যা স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু যে নৌকা দিয়ে সবাই যাবে, সেই পানি যদি দুর্গন্ধ হয়, মশা থাকে, তাহলে সেটি সম্ভব নয়, কেউ যাবে না সেখানে। তাই দুর্গন্ধ দূর করার জন্য সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা জরুরি।

আতিকুল ইসলাম বলেন, সরকারের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর এখানে এসেছে। আমাদের স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মেয়র আরো বলেন, হাতিরঝিল, বারিধারা, গুলশান, বনানী, উত্তরা লেকে মাছ ছাড়লে মাছগুলো সাথে সাথে মরে যায়, কারণ পানি দূষিত; পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি আছে।

তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলামের কাছে খালের মত লেকগুলোও সিটি কর্পোরেশনের অধীনে হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। মেয়র বলেন, এসকল লেকের পানি আমরা স্বচ্ছ করতে পারব। মাছের চাষ হবে এখানে। এটি সম্ভব। এছাড়া বিনোদনের জন্য ওয়াটার পার্কও এখানে করা যায়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে পানির অবস্থা দেখে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হয়।

আতিকুল ইসলাম বলেন আমার স্বপ্ন – খালের পাশ দিয়ে মানুষ হেঁটে বেড়াবে এটি আমি চাই। সাইকেলের লেন হবে, গাছ লাগানো হবে। খালের পানি কিভাবে দুর্গন্ধমুক্ত করতে পারি এটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভালবাসা দিবস একদিন, কিন্তু আসুন প্রতিদিন ঢাকা শহরকে ভালোবাসি আতিকুল ইসলাম নগরবাসীর কাছে এই আহবান জানান।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সেলিম রেজার সঞ্চালনায় কর্মশালায় ওয়াসা, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অদিদপ্তর, আর্কিটেক্ট, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন সোসাইটির প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি, বুয়েট, এমআইএসটি, গণমাধ্যমের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

এছাড়া ডিএনসিসির পক্ষে প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিরুল ইসলাম, এমআইএসটি এর পক্ষে কর্নেল এ এন এম ফয়েজুর রহমান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। কর্মশালায় অন্যান্যের মধ্যে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান, স্থপতি ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মোবাশ্বের হোসেন, স্থপতি ইকবাল হাবিব, জাহাঙ্গীর নগরের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ, ড. আদিলুর রহমান, ডিএনসিসির কর্মকর্তা, ওয়ার্ড কাউন্সিলরবৃন্দ প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

ad

পাঠকের মতামত