11561

স্মৃতিতে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫

অনলাইন ডেস্ক: ৪৫ বছর আগের স্মৃতি। কুমিল্লা শহরতলী গ্রাম চান্দপুরের বাড়ির দক্ষিণ দিকের ঘর থেকে ভোর বেলায় উঠলাম। উদ্দেশ্য বাড়ির পুকুর ঘাটে যাবো। পশ্চিম দিকের ঘর থেকে চাচাতো বোন শানি ট্রানজিস্টর নিয়ে দৌড়ে এসে বললো, রেডিও শুনেন। মেজর ডালিমের কন্ঠস্বর। ডালিম বারবার ঘোষণা দিচ্ছিল। ঘোষণায় ছিল ‘ কুখ্যাত শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।’ ঘোষণা শুনে মাটিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। পেছন থেকে আমার বড়বোন জাহানারা বেগম আঁতকে ওঠে বললো, শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে? তখন কতক্ষণ নীরবে দাড়িয়ে ছিলাম ঠিক জানিনা। পুকুর থেকে ফিরে এসে পাজামা-পাঞ্জাবি পড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। বড় আপা কিছু খেতে বলছিল। কিছুই না বলে বাড়ির পাশেই গোমতীর আইল ধরে হাটা শুরু করলাম। তখনো পুরনো গোমতীর পাড় উঁচু ছিল। তখনো কেউ ঘুম থেকে জাগেনি। সবদিক তখন অনেক খোলামেলা। হারুণ স্কুলের পাশে দিয়ে পুরনো গোমতীর ওপর নির্মিত রাস্তা হয়ে গাংচর এলাম। একটা রেস্তোরা খোলা। দুজন রেডিও শুনছেন আর নিজেরা কথা বলছেন। তাদের দুজনকে চিনতাম। একজন প্রাক্তন পৌর কমিশনার আবদুল লতিফ, অপরজন সেই সময়ের কমিশনার ফজলুর রহমান। আমাকে তারা কাছে ডেকে নিলেন। আবদুল লতিফ বললেন, রিপোর্টার এটা কি হলো? তিনি আরো বললেন, শেখ সাহেব না জানলেও আওয়ামীলীগের কর্মীদের অনেকেই জানতেন এমন একটা কিছু হবেই।

সেখান থেকে আবার হাটা শুরু করলাম। গাংচর, ঋষিপট্টি হয়ে উঁচু রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে গেলাম সংরাইশ। পৌরসভার চেয়ারম্যান, আবদুল আউয়াল। নিজের বাসগৃহের বারান্দায় আরো দুজনকে নিয়ে রেডিও শুনছেন। আমাকে দেখেই বললেন, আসার পথে কি কি চোখে পড়লো? বললাম, নির্জন পথ। কেবল দুটি রেস্তোরা খোলা। একটি ছেলে চা-খাস্তা বিস্কুট দিয়ে গেল। আওয়াল ভাইকে দেখলাম টেলিফোনে কথা বলতে। তার কথাতেই বোঝা গেল কোতোয়ালির ওসির সঙ্গে কথা বলছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা। তারপরের টেলিফোনে যে ডিসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলছেন তাও বোঝা গেল। রিসিভার রেখে বললেন, রিপোর্টার, ডিসি সাহেব কি বললো জানো? বললাম, আপনি বললে জানবো। ডিসি আবদুল্লাহ হারুণ পাশা আতঙ্কে আছেন। ওপরের হুকুমের অপেক্ষায় আছেন। তখন বেলা ১০টা বেজে গেছে। ফেরার পথে আওয়াল ভাই জোরে বললেন, রিপোর্টার কোন তথ্য পেলে টেলিফোনে জানিয়ে দিও। চকবাজারের ভিতর দিয়েই পাকা রাস্তায় ওঠলাম। একটি দোকানও খুলেনি। রাস্তা নির্জন। কেবল রূপালী সিনেমা হলের সামনের রেস্তোরাগুলো খোলা। ভিতরে সামান্য কিছু লোক। কাপড়িয়া পট্টি, গোয়ালপট্টি, ছাতিপট্টি হয়ে রাজগঞ্জ এলাম। নির্জন পথ। কেবল রাজগঞ্জ বাজার থেকে সামান্য কয়েকজনকে কিছু কিনে ফিরতে দেখলাম। তারপর মনোহরপুর হয়ে লিবার্টি সিনেমা হলের পাশে এলাম। ট্রাফিক আইল্যান্ডের কাছে যেতে এক যুবকের কন্ঠস্বর শুনলাম। পাশের যুবককে বলছে, কি করতে বাইর হইছস? মরতে চাস নাকি? কান্দিরপাড় মসজিদের সামনে দিয়ে জিলা স্কুল রোড হয়ে স্টেডিয়ামে এলাম। তখন বেলা হয়ে গেছে। বারোটার ওপরে। পেলাম এস এ রউফকে তিনি একজন ক্রীড়া সংগঠক। সাইনবোর্ড লেখা ছিল পেশা। গ্যালারির নিচের সব মার্কেট বন্ধ। তিনি বললেন, শেখ সাহেবকে নাকি মেরে ফেলেছে? দেখলাম একমাত্র মাইনুদ্দিন বেকারী খোলা। ভেতরে রেডিও শুনছেন কয়েকজন। সবাই নীরব। এমন সময় কান্দিরপাড় মসজিদের মাইকে যুহরের আযান শুনলাম। নীরব-নিস্তব্ধতায় আযানের ধ্বনি প্রাণে সাহস সঞ্চার করলো। মোগলটুলি হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। সেখানেও সবকিছু বন্ধ। কেবল আনছারিয়া রেস্টুরেন্ট খোলা ছিল। সেদিন বিকালে নতুন চৌধুরী পাড়া রূপসী বাংলা কার্যালয়ে গেলাম। সন্ধ্যায় অধ্যাপক আবদুল ওহাব বললেন, এডভোকেট আহমেদ আলীর বাসগৃহে যাবার জন্য। মাগরিব হয়ে গেছে। গিয়ে দেখলাম টিনের আটচালা ঘরে পুলিশ লাইন মসজিদের ইমাম মাওলানা ফখরুল ইসলাম পবিত্র কুর’আন তিলাওয়াত করছেন। পরে বঙ্গবন্ধুর রূহের মাগফিরাত কামনা করে মুনাজাত করলেন। খুব কম সময়ে কাজটা করলেন। পরদিন সকালে গেলাম পুরাতন চৌধুরী পাড়ায় সাপ্তাহিক আমোদ কার্যালয়ে। গিয়ে দেখলাম সাদা পোশাকের দুজন লোক মোঃ ফজলে রাব্বীর সঙ্গে কথা বলছেন। একজন বয়স্ক, ধবধবে সাদা দাড়ি। তিনি বলছিলেন নেতারা কেউই বাড়িতে নেই। আপনি এ বিষয়ে কিছু জানেন? ফজলে রাব্বী বললেন আজকাল পত্রিকা প্রকাশিত হয় না। সেজন্য কারো কোনও খবরই তিনি রাখেন না। কিছুক্ষণ পর লোক দুটি চলে গেল। ফজলে রাব্বী সাহেব জানালেন তারা দুজনই ছিলেন ডিবির লোক।

ads

১৭ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে টাউন হল মাঠের পূর্বদিকে যেখানে বর্তমানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রয়েছে, সেখানে দেখলাম বঙ্গবন্ধুর জন্য গায়েবানা জানাযার নামাজ হতে। কান্দিরপাড় মসজিদের ইমাম মাওলানা মোঃ ইসহাক গায়েবানা নামাজ পড়ালেন। টাউন হল গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম মাত্র কয়েকজন জানাযায় অংশ নিয়েছেন। যাদের চিনলাম তারা হচ্ছেন, ন্যাপের জাকির হোসেন, মোঃ ওমর ফারুক, ছাত্রলীগের রুস্তম আলী, জহিরুল ইসলাম সেলিম, কাজী আবুল বাশার। কিছু দূরে দীপক রায়। জহিরুল ইসলাম সেলিম কি জানি বলছিলেন। দূর থেকে শুনতে পাইনি। পুলিশের গাড়ি এসে গিয়েছিল। গায়েবানা জানাযা শেষে তারা খুব দ্রুত সেখান থেকে সরে রাণীর দীঘির পাড় ভিক্টোরিয়া কলেজ শহীদ মিনারে যায়। সেখানে জহিরুল ইসলাম সেলিম বক্তব্য রাখেন।

সেই সপ্তাহের কোন একদিন বিকেল। তারিখটা মনে করতে পারছি না। অধ্যাপক আবদুল ওহাব কুমিল্লা কলেজের সেই সময়ের অধ্যক্ষের অফিসের সামনে কবিতা পাঠের আসরের ব্যবস্থা করলেন। কোন ব্যানার নেই। মাইক নেই। দুটি চাদর বিছিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন। আমাকে বলা হলো উপস্থাপনা করার জন্য। অনুষ্ঠানে কথা বললেন, সাপ্তাহিক আমোদ সম্পাদক মোঃ ফজলে রাব্বী, জহিরুল হক দুলাল ও অধ্যাপক আবদুল ওহাব। উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক রেজাউল করিম শামীম। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পড়লেন শামসুন্নাহার রাব্বী, স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন আলী হোসেন চৌধুরী, নিরু শামীম ইসলাম, শওকত আহসান ফারুক, সৈয়দ আহমাদ তারেক, ফরিদ মুজহার, ফখরুল হুদা হেলাল, ফখরুল ইসলাম রচি, হাসান ফিরোজ, আনোয়ারুল হক, আবুল কালাম হোসাইন বাদল, আলাউদ্দিন তালুকদার, অধ্যাপক আবদুল ওহাব এবং আমি আবুল হাসানাত বাবুল। ছড়া পড়লেন জহিরুল হক দুলাল। আমি রূপসী বাংলা ও ‘আমরা জ্যোৎস্নার প্রতিবেশী’র নাম উল্লেখ করেছিলাম। অধ্যাপক আবদুল ওহাব বললেন, এই দুঃসময়ে আমরাই বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে কবিতা পড়লাম। কোন সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম নেয়ার দরকার নেই। নিজেরাই নিজেদের দায়িত্বে কবিতায় কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করলাম। সেই অনুষ্ঠানে কারো কারো কবিতা প্রতিবাদী ছিল। সেই সময়কালে কোন প্রকাশনা কিংবা সংবাদপত্র ছিল না। যার প্রেক্ষিতে তার কোন খবর তখন ছিল না। এ নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আগস্ট, ১৯৭৫ নিয়ে অভিবাদনে অনেক স্মৃতিচারণ করেছি। সেই সময়কালটা কেমন গিয়েছিল তা আজকাল কাউকে বুঝিয়ে বলা যাবে না।

ads

বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগ নিয়ে আজীবন ছিলেন এডভোকেট আহমেদ আলী। তিনিও চলে গেছেন। এভাবেই চলে গেছেন আরো অনেকে। ১৫ আগস্টের হৃদয় বিদারক স্মৃতি নিয়ে আছি ৪৫ বছর।

(সাংবাদিক আবুল হাসনাত বাবুল)

ad

পাঠকের মতামত