12920

করোনা চিকিৎসায় অকুতোভয় যোদ্ধা ডা. আল আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের স্বেচ্ছায় চিকিৎসাসেবা দিতে যেসব চিকিৎসক এগিয়ে এসেছিলেন ডাঃ মুন্সী মোঃ আল-আমিন ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির একজন। তিনি যখন এগিয়ে এসেছিলেন তখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। অদৃশ্য এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সামনের কাতারের যোদ্ধারাও আক্রান্ত হয়েছেন। ভাইরাসটির চিকিৎসা করার বিষয়ে সহকর্মীদের মধ্যে ছিল ভয়। সে সময় ডাঃ মুন্সী মোঃ আল-আমিন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব হেলথ সায়েন্স জেনারেল হাসপাতালে (বিআইএইচএস বারডেম) এর ডায়বেটিস ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত থেকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

ডা. আল-আমিন বলেন, আমাদের কাছে এবং একের পর এক রোগীদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসা অন্য সহকর্মীদের কাছে এটি ছিল একটা বিশাল মুহুর্ত। তবে ডাঃ আল আমিনের জন্য এটি এক বিপরীতধর্মী অভিজ্ঞতাও বটে। তিনি একদিকে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে তার সহকর্মীদের মৃত্যুবরণ করতে দেখছেন, অন্যদিকে ডায়বেটিসসহ কিডনী জটিলতায় অসংখ্য রোগীকে জটিল পরিস্থিতি থেকে সেরে উঠাতে দিনভর কাজ করতে হয়েছে তাকে। রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কোভিড-১৯ পজিটিভ বা নেগেটিভ রিপোর্ট যাই আসুক না কেন, লক্ষ্মণ থাকলেই চিকিৎসা শুরু করে দেই। পাশাপাশি আরও কিছু পরীক্ষা করাই, যা কোভিডের লক্ষণ গুলোকে সাপোর্ট করে। তখন দেরি না করে সব নিরাপদ ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। এখানে হারানোর কিছু নাই। রিপোর্ট একবার নয়, অসংখ্যবার ভুল আসতে পারে। তাই চিকিৎসা শুরু করে আমরা পর্যাক্রমে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রোগীদের পর্যবেক্ষণে রাখি। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যারা তরুণ তাদের ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার বিনিময়ে আমরা তাদের প্লাজমা ডোনেট করতে উৎসাহ দিচ্ছি। আর যারা সচ্ছল তাদের বলেছি, কোনো অভাবী পরিবারের চিকিৎসার খরচ যেন সম্ভব হলে তারা বহন করেন। অভাবী পরিবারগুলোর নম্বর সচ্ছলদের দেওয়া হচ্ছে। তারা চাইলে তাদের মতো করে অভাবী রোগীদের সাহায্য করবেন। অনেকেই রাজি হয়েছেন সাহায্য করতে।
আল-আমিন বলেন, যাদের রিপোর্ট ফলস নেগেটিভ বা ফলস পজিটিভ আসছে, তারা কোনো চিকিৎসা না পেয়েই মারা যাবে, তা হবে না। ঘরে বসেই চিকিৎসা দেওয়া এবং নেওয়া সম্ভব। এটা করতে পারলে ক্রিটিক্যাল রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্র উম্মুক্ত হবে। কেউ তখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মারা যাবে না। তিনি হাসপাতালের পাশাপাশি অনলাইন/মোবাইলে চিকিৎসা পরামর্শসহ রোগীরদের জন্য নিজের অনলাইন পেইজ এ করোনাসহ অন্যান্য বিষয়ে সচেতনমূলক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সঠিক তথ্য প্রচার করে রোগীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য বার্তা প্রধান করে যাচ্ছেন।

ads

রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়ার তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ডাঃ মুন্সী মোঃ আল-আমিন বলেন, আমি আমার মা ও বাবার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তিনি আরও জানান, বিপদের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও তারা আমাকে কাজটি করতে উৎসাহিত করেছিলেন। তারা আমাকে বলেছিলেন যে, আমি একজন ডাক্তার ও তার সন্তান এবং আমার ভয় পাওয়া উচিত হবে না। কারন আমি বিশেষ প্রয়োজনের সময় মানুষের সেবা করছি এবং আল্লাহ আমাকে দেখবেন।

ডাঃ আল-আমিন জানান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার স্ত্রী জাকিয়া আক্তার এবং দুই সন্তান আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রাহিমের ভূমিকাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারন তাদের সহযোগিতা না পেলে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। গত মার্চ মাসের প্রথমদিকে যখন বিআইএইচএস কোভিড-১৯ রোগী ভর্তি হয়েছিল তখন থেকেই তিনি তাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেছিলেন এবং তার কাজের এরকম চরিত্রের কারনেই তাকে তাঁর পরিবার থেকে শারীরিকভাবে দূরে থাকার মতো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

ads

ডাঃ আল-আমিন বলেন, আমার সন্তানরা আমার কাছে আসার জন্য বেশ আগ্রহী। কিন্তু আমি তাদেরকে আমার কাছে আসতে দিই না। কারন আমার অবশ্যই নিজে থেকে দূরে থাকা উচিত। তিনি আরও বলেন, তারা আমাকে করোনাভাইরাসকে বাংলাদেশ থেকে বাইরে তাড়িয়ে দিতে বলে (যাতে করে তারা আমাকে দেখতে পাবে)। কারণ তখন তারা বাইরে যেতে এবং খেলতে পারবে।

বিআইএইচএস বারডেমের এই চিকিৎসক জানান, করোনার কোনও রোগী যদি তার বাবা, মা, ভাই বা বোন হতেন তবে তিনি কি করতেন-নিজেকে এমন একটি জিজ্ঞাসাই ছিল তার চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করার আরেকটি কারণ।

ডাঃ মুন্সী মোঃ, সিলেট নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ থেকে ২০০৪ সালে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ইন্টারনাল মেডিসিনে ট্রেনিংসহ ডায়বেটিসের উপর বিশেষ কোর্স সিসিডি সম্পন্ন করেন। তিনি নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। দীর্ঘ ১৫ বছর জোরেল ফিজিসিয়ান হিসেবে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের পাশাপাশি ঢাকা শিশু হাসপাতালের মতো ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র রিসার্চ ফিজিয়ান হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আমেরিকা হার্ড এসোসিয়েশন সিঙ্গাপুর থেকে শিশু স্বাস্থ্য উচ্চতর ট্রেনিং করেন ২০১৬ সালে। বর্তমানে তিনি বারডেম হাসপাতালের বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব হেলথ সায়েন্স এর বাসাবো শাখায় ইন্টারনাল মেডিসিন স্বাস্থ্য সেবা প্রদানসহ তিনি ঢাকা ডি আকবর হেলথ কেয়ার, বসুন্ধরা ও বিসমিল্লাহ ফার্মেসী, নন্দীপাড়া বাজার, খিলগাঁত্ত এ নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ।

ad

পাঠকের মতামত