এপ্রিলে চীন সফরে যাচ্ছেন ট্রাম্প: শুল্ক যুদ্ধ ও তাইওয়ান ইস্যুতে নজর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আসন্ন এপ্রিলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক জমকালো শীর্ষ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বাণিজ্যে টানাপোড়েন, তাইওয়ান সংকট এবং প্রযুক্তি নিয়ে বিরোধ এই দুই নেতার সম্ভাব্য ‘বন্ধুত্বে’ জল ঢেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউজের একজন কর্মকর্তা শুক্রবার নিশ্চিত করেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ৩১ মার্চ তিন দিনের সফরে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। যদিও চীন সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের তারিখ নিশ্চিত করেনি, তবে ট্রাম্প এরই মধ্যে এই সফর নিয়ে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। এপ্রিলে আমি চীন যাচ্ছি। এটি হতে যাচ্ছে এক অভাবনীয় সফর।”
২০১৭ সালের বেইজিং সফরের স্মৃতিচারণ করে ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেন, তিনি চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রদর্শনী দেখতে চান। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের পেছনে বেইজিংয়ের গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জুলিয়ান গেউইর্টজ বলেন, “শি জিনপিং বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চান যে, তিনি ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তিনি দেখাতে চান, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটিও এখন চীনের সঙ্গে লড়াই করার চেয়ে আপস করাকেই নিরাপদ মনে করছে।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে দরকষাকষির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন নিজ দেশের সুপ্রিম কোর্টের এক রায় তার ক্ষমতাকে কিছুটা সীমিত করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত বেশ কিছু শুল্ককে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছে। যদিও ট্রাম্প এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নতুন ১৫ শতাংশ আমদানি কর ঘোষণা করেছেন, তবে এই আইনি ধাক্কা শি জিনপিংকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ সিনবো বলেন, “এই রায় চীনকে আসন্ন বাণিজ্য আলোচনায় এগিয়ে রাখবে এবং বেইজিং অন্যান্য ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির সুযোগ পাবে।”
প্রেসিডেন্ট শির জন্য এই সম্মেলনের মূল প্রাপ্তি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা। চীনের অর্থনীতি বর্তমানে রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া তিনি চীনা সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন, যার ফলে পিএলএ-এর শীর্ষ জেনারেল ঝাং ইউক্সিয়া দুর্নীতির অভিযোগে অপসারিত হয়েছেন।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইভান এস মেদেইরোস বলেন, “শি এখন সময় এবং স্থিতিশীলতা চান। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং সেনাবাহিনী গুছিয়ে নিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক তাকে সাহায্য করবে।”
এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে তাইওয়ান ইস্যু। শি জিনপিং চাইবেন ট্রাম্প যেন তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেন। তবে ট্রাম্প যদি ডিসেম্বরে অনুমোদিত ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির ধারাবাহিকতায় নতুন কোনও অস্ত্রের প্যাকেজ অনুমোদন করেন, তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আবার নিম্নমুখী হতে পারে। এমনকি এর ফলে শীর্ষ সম্মেলনটি বাতিলও হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের কিছু শুল্ক বাতিল হওয়ার পর তিনি যদি নতুন কোনও আইনি অজুহাতে আবারও শুল্ক চাপান, তবে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। অধ্যাপক উ সিনবো সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প যদি আবারও কঠোর শুল্ক নীতিতে ফিরে যান, তবে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনা কমিয়ে দিয়ে তার প্রতিশোধ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে এপ্রিলে বেইজিংয়ের এই বৈঠকটি কেবল আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে।










